আট হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে। তবে শিক্ষকসংকট ও অনিয়মিত পাঠদানের কারণে নিয়মিত ক্লাসের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। অনেক বিভাগে অনার্সের ক্লাস সপ্তাহে মাত্র দুই দিন হয়। পরীক্ষা থাকলে সেই ক্লাসও বন্ধ থাকে। ফলে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষেও তাদের উপস্থিতি কম।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজে শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪৯টি। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক ৩১ জন। এর মধ্যে অধ্যাপক ২, সহযোগী অধ্যাপক ৪, সহকারী অধ্যাপক ১৪, প্রভাষক ২৫, প্রদর্শক ৩ ও গ্রন্থাগারিক ১টি পদ রয়েছে । উচ্চমাধ্যমিকের বাধ্যতামূলক আইসিটি বিষয়েও কোনো শিক্ষক নেই।
১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে প্রথমে শুধু ইন্টারমিডিয়েট কোর্স চালু ছিল। ১৯৬৯-৭০ শিক্ষাবর্ষে বিএ ও বিকম (পাস), ১৯৭২ সালে বিএসসি এবং ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে সম্মান কোর্স চালু হয়। ১৯৮৬ সালে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। সাত একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজে নতুন ছয়তলা ভবন নির্মাণ হওয়ায় শ্রেণিকক্ষ সংকট কিছুটা কমেছে। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় ভবনটির শ্রেণিকক্ষে এখনো পাঠদান শুরু হয়নি।
কলেজে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি (পাস) কোর্সের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে সম্মান কোর্স রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনাকালে সম্মান শ্রেণির পাঠদানের সময় কমিয়ে যে রুটিন করা হয়েছিল, এখনো তা বহাল রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণ দেখিয়ে অনার্সের ক্লাস সপ্তাহে দুই দিন করা হয়েছে। অনেক সময় ইনকোর্স ও টেস্ট পরীক্ষা থাকায় নির্ধারিত ক্লাসও হয় না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকার কথা। কিন্তু কলেজটিতে উপস্থিতি অনেক কম। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তারা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। কোনো কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ইনকোর্স পরীক্ষায় প্রত্যাশিত নম্বর না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
একাদশ ও অনার্সের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিকে ক্লাস ও উপস্থিতি ভালো থাকে। এক মাস পর থেকেই উপস্থিতি কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে তা এতটাই কমে যায় যে নিয়মিত ক্লাসও হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্র বলেন, ‘আমি ২০২৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। কিন্তু কলেজে কোনো দিনই ঠিকমতো ক্লাস করার সুযোগ পাইনি। পাঠদান নিয়মিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীরাও কলেজে আসে না। তাই বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়ছি।’
অনার্সের এক ছাত্র বলেন, ‘ঈশ্বরদীর একমাত্র সরকারি ও ঐতিহ্যবাহী কলেজের শিক্ষাদানের অবস্থা খুবই করুণ। শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম, কোনো ক্লাসই ঠিকমতো হয় না। শিক্ষকরাও যে যার মতো আসেন ও যান।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা। কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শিক্ষক পরিষদের সাহিত্য ও ক্রীড়া সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা পাঠদানের বিষয়ে সচেতন। উপস্থিতি কম হলেও নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।’ কোনো কোনো শিক্ষক পড়াতে চান না—এ অভিযোগও ঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কলেজে শিক্ষক সংকট রয়েছে। তারপরও নিয়মিত পাঠদান চলছে। এ জন্য কয়েকজন অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো শিক্ষক পাঠদানে অনীহা দেখালে তা জানাতেও বলা হয়েছে। শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়াতে অভিভাবক সমাবেশসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষক শূন্য পদ পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’