পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মানুষের আগ্রহের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো, কীভাবে প্রথম ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আগ্রহের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সহজ ভাষায় তুলে ধরা প্রয়োজন।
ফিশন বিক্রিয়ার প্রথম শর্ত: উপযুক্ত পারমাণবিক জ্বালানি
ফিশন বা নিউক্লীয় বিভাজন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে তুলনামূলকভাবে ছোট দুটি নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি নির্গত হয় এবং সাধারণত আরও কয়েকটি নিউট্রন উৎপন্ন হয়।
ইউরেনিয়াম-২৩৫ এমন একটি আইসোটোপ, যা নিউট্রন শোষণ করলে সহজেই ফিশন বিক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। ইউরেনিয়াম-২৩৮-এর ক্ষেত্রেও ফিশন সম্ভব, তবে এর আচরণ ইউরেনিয়াম-২৩৫ থেকে আলাদা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের মাধ্যমে ফিশন বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফিশন বিক্রিয়ায় নিউট্রনের ভূমিকা
ফিশন বিক্রিয়া ঘটাতে নিউট্রন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিউট্রনের বৈদ্যুতিক চার্জ না থাকায় এটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত পরমাণুর নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। উপযুক্ত নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর নিউক্লিয়াসে শোষিত হলে নিউক্লিয়াসটি অস্থিতিশীল হয়ে ভেঙে যেতে পারে।
এ সময় শক্তির পাশাপাশি সাধারণত দুই বা তিনটি নতুন নিউট্রন নির্গত হয়। এসব নিউট্রন অন্য উপযুক্ত নিউক্লিয়াসে ফিশন ঘটাতে পারে। এভাবে একটি বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন নিউট্রন পরবর্তী বিক্রিয়াগুলোকে চালিত করে।
যখন এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় নিজে থেকেই ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তখন তাকে স্বনির্ভর শৃঙ্খল বিক্রিয়া বলা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য।
প্রথম নিউট্রন আসে কোথা থেকে?
এবার প্রশ্ন হলো, ফিশন বিক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রথম নিউট্রন কোথা থেকে আসে?
ইউরেনিয়ামসহ কিছু ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভাজিত হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্বতঃস্ফূর্ত ফিশন। এ সময় কোনো বাহ্যিক নিউট্রন দিয়ে আঘাত করার প্রয়োজন হয় না; নিউক্লিয়াস নিজে থেকেই বিভাজিত হয় এবং নিউট্রন নির্গত করতে পারে।
ইউরেনিয়াম-২৩৮-এর স্বতঃস্ফূর্ত ফিশনের হার ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর তুলনায় বেশি। তবে এ ধরনের বিভাজনের হার খুবই কম। বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক জ্বালানি চুল্লিতে থাকলে স্বতঃস্ফূর্ত ফিশনের মাধ্যমে কিছু নিউট্রন উৎপন্ন হয়। এগুলো শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক নিউট্রন উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রিয়া পূর্ণমাত্রায় শুরু হয় না কেন?
পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপন করা আর নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া চালু করা এক বিষয় নয়। জ্বালানি স্থাপনের পর চুল্লির বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা করা, নিউট্রনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ করা জরুরি।
চুল্লির নকশা অনুযায়ী নিউট্রন শোষক, নিয়ন্ত্রণ দণ্ড এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহার করে নিউট্রনের সংখ্যা ও শৃঙ্খল বিক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বোরন ও গ্যাডোলিনিয়ামের মতো পদার্থ নিউট্রন শোষণ করতে পারে। তবে এগুলোর ব্যবহার, পরিমাণ ও অবস্থান চুল্লির নকশা এবং পরিচালনাপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি স্থাপনের পর চুল্লি এমন অবস্থায় থাকতে পারে, যেখানে শৃঙ্খল বিক্রিয়া নিজে থেকে ক্রমাগত বাড়তে পারে না। এ অবস্থায় চুল্লির নিউট্রন-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত নির্ধারিত নিয়মে সমন্বয় করে চুল্লিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে চালুর উপযোগী করা হয়।
তাহলে প্রথম ফিশন বিক্রিয়া কীভাবে শুরু হয়?
সহজভাবে বললে, পারমাণবিক চুল্লিতে প্রথম ফিশন ঘটার জন্য বাইরে থেকে আলাদা করে একটি নিউট্রন সরবরাহ করতেই হবে—এমন নয়। জ্বালানিতে স্বতঃস্ফূর্ত ফিশন থেকে উৎপন্ন নিউট্রন প্রাথমিক বিক্রিয়া ঘটাতে পারে। এরপর চুল্লির অবস্থা উপযুক্ত হলে একটি ফিশন থেকে উৎপন্ন নিউট্রন অন্য নিউক্লিয়াসে ফিশন ঘটায় এবং এভাবে শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে শুধু নিউট্রন শোষক কমিয়ে দিলেই যে নিরাপদে বিক্রিয়া শুরু হবে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। চুল্লির নকশা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ দণ্ড, নিউট্রন শোষক, শীতলক, পরিমাপব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা-প্রক্রিয়া সমন্বিতভাবে কাজ করে। প্রশিক্ষিত পরিচালনাকারীরা অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করে ধাপে ধাপে চুল্লিকে চালু করেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পারমাণবিক বোমার মূল পার্থক্য
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্দেশ্য হলো নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাপ উৎপন্ন করা। সেই তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি হয়, বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
অন্যদিকে, পারমাণবিক বোমায় অত্যন্ত অল্প সময়ে বিপুল শক্তি নির্গত হওয়ার মতো অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া সৃষ্টি করা হয়। অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই নিউক্লীয় বিভাজনের মৌলিক বিজ্ঞান জড়িত থাকলেও উদ্দেশ্য, জ্বালানির বিন্যাস, নকশা ও বিক্রিয়া পরিচালনার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শেষ কথা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হওয়ার বিষয়টি বুঝতে হলে তিনটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—উপযুক্ত পারমাণবিক জ্বালানি, নিউট্রনের উপস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠার উপযোগী চুল্লি-অবস্থা। এসব শর্ত পূরণ করে এবং নিরাপত্তার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেই পারমাণবিক চুল্লি চালু করা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু বিক্রিয়া শুরু করা নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত রাখা।
লেখক: প্রমোদ চন্দ্র বৈদ্য