বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (আরএনপিপি) এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি)-এর ১৬ মেগাপাসকেল (এমপিএ) চাপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে শনিবার দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও দেশে পৌঁছেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হলেও কমিশনিংয়ের বিভিন্ন ধাপে জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচিতে বিলম্ব হয়েছে। বিশেষ করে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি)-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।
তবে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এসব ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একটি বড় কম-কার্বন বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে যুক্ত হওয়ার কথা। প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ইউরেনিয়ামের চালান রূপপুরে পৌঁছানো এবং প্রথম ইউনিটের পিওআরভি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানকে কমিশনিং কার্যক্রমের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যেই প্রকল্পের ব্যয়, নিরাপত্তা, প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও নেতিবাচক প্রচারণা নতুন করে সামনে এসেছে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই পারমাণবিক নিরাপত্তা, ব্যয় এবং কর্মকর্তা-প্রকৌশলীদের ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ ও প্রচারণা হয়ে আসছে। সর্বশেষ রূপপুর প্রকল্পের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিনিয়র পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ড. জাহেদুল হাসানকে ঘিরেও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ প্রচার হচ্ছে।
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে এসব প্রচারণাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন রূপপুরে কর্মরত অনেক প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তাঁদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অভিযোগ প্রচার হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাবমূর্তির পাশাপাশি প্রকল্পে কর্মরতদের মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর) ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে গঠনমূলক সমালোচনা ও জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। তবে অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হলে প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তিনি প্রাতিষ্ঠানিকএকাধিক পদে বেতন নেওয়ার অভিযোগ:
ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকার অভিযোগের বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে তাঁকে উচ্চতর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে তিনি এনপিসিবিএলের পূর্ণকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এ পদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।
একই সময়ে একাধিক পদের জন্য পৃথক বেতন নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা সরকারি নীতিমালারও পরিপন্থি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট কমিটি এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়।
জনবল ও প্রশিক্ষণ:
জনবল ও প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রচারিত বিভিন্ন তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনপিসিবিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনপিসিবিএলে মোট ১ হাজার ৯২২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯৯৭ জন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৭ জন প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন, যা মোট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
ড. জাহেদুল হাসানের দাবি, গ্রেড ১৬ থেকে ১৯-এর প্রায় ১০০ কর্মীর প্রতিষ্ঠানত্যাগকে বিশেষায়িত পারমাণবিক জনবলের প্রস্থান হিসেবে দেখানো সঠিক নয়। তাঁদের মধ্যে অ্যাটেনডেন্ট, টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন পদে কর্মরত ব্যক্তিরাও ছিলেন। তাই মোট কর্মীপ্রস্থান এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের প্রতিষ্ঠানত্যাগকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উচ্চতর পদে দায়িত্ব অর্পণ:
উচ্চতর পদে দায়িত্ব অর্পণের বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনপিসিবিএল এমডি। তাঁর বক্তব্য, শপ ম্যানেজার ও ডেপুটি শপ ম্যানেজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ক্ষমতাপ্রাপ্ত বোর্ড কমিটি নেয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এককভাবে এসব পদে কাউকে নিয়োগ বা দায়িত্ব দিতে পারেন না।
তাই বিদ্যমান কর্মীদের উচ্চতর দায়িত্বে অর্পণকে ব্যক্তিগত নিয়োগ কিংবা একক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেন তিনি।
কমিশনিংয়ের দায়িত্ব বিএইসির:
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং কার্যক্রম নিয়েও দায়িত্বের বিভাজন তুলে ধরেন ড. জাহেদুল হাসান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আর এনপিসিবিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেটিং অর্গানাইজেশন। ফলে কমিশনিং-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা বিলম্বকে সরাসরি এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়।
রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া:
রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ড. জাহেদুল হাসান।
তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়নি। তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে নেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাশিয়ায় অবস্থানরত পরিদর্শকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এর ভাড়া ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে প্রকল্পের জেনারেল কন্ট্রাক্টর জেএসসি এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (এএসই)।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, বিভিন্ন সময়ে মোট ৪১ জন কর্মকর্তা এসব অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন। তাঁদের জন্য সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছিল। একই সময়ে তাঁরা হোটেল ভাতাও গ্রহণ করেননি বলে জানান তিনি।
৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ:
অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার ৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে অমূলক ও ভিত্তিহীন দাবি করে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও অর্থ পরিশোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং পরবর্তী অডিট বিবেচনায় না নিয়ে এর দায় ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ওপর চাপানো তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি পরে ছয় সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট দলের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হয়। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব। বাংলাদেশ দূতাবাসের রাশিয়ায় কর্মরত দুই কর্মকর্তাও এতে অংশ নেন। অডিট প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান:
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, রূপপুর বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অফিস আদেশ, পরিচালনা পর্ষদ ও কমিটির সিদ্ধান্ত, সরকারি আদেশ, অডিট প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, কমিশনিং কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।