ঈশ্বরদীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, অনলাইন গেম ও বেটিং অ্যাপের প্রলোভনে পড়ে তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই সর্বনাশা ফাঁদে।

সহজে ও দ্রুত টাকা আয়ের আশায় অনেকেই প্রথমে অল্প টাকা বিনিয়োগ করলেও পরবর্তীতে হারাচ্ছেন সর্বস্ব। এর ফলে এলাকায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে তীব্র পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা।

পৌরসভার এক চায়ের দোকানে গল্পে গল্পে নাম না বলা এক যুবক বলেন, প্রথমে এক কাস্টমারের মাধ্যমে তিনি এই অনলাইন জুয়ার সঙ্গে পরিচিত হন। ওই কাস্টমারকে মোবাইলে অনলাইন গেম খেলতে দেখে তার নিজেরও আগ্রহ তৈরি হয়। পরে নিজের স্মার্টফোনে ৩০০ টাকা বিকাশ করে খেলা শুরু করেন। প্রথম দিনেই ৩০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১ হাজার ২০০ টাকা জিতে যান তিনি। এরপর আরও বেশি লাভের আশায় বারবার টাকা বিনিয়োগ করতে থাকেন।

তিনি আরো বলেন, ‘শুরুর দিকে কিছু টাকা জিতলেও পরে যা জিতছি তার চেয়ে বেশি হারাইছি। এখন এই অনলাইন জুয়া আমার কাছে নেশার মতো হয়ে গেছে। চাইলে এখন আর ছাড়তে পারি না।’

তিনি আরও জানান, দোকানে প্রতিদিন যা আয় হয়, তার বেশির ভাগই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইন গেমে চলে যায়। এক সময়ের পণ্যে ভরা তার দোকানটি এখন জুয়ার আসক্তিতে প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এক ব্যক্তির সহধর্মিণী নিজের ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে জানান, তার স্বামী বাসায় ফিরেই সব সময় মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং সামান্য বিষয়েও মেজাজ খিটখিটে করে রাখেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী মোবাইলে অনলাইন জুয়া খেলেন এবং সেখানে নিয়মিত টাকা বিনিয়োগ করেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘জিতলে তার মন ভালো থাকে, আর হারলে ঘরের সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আগে আমাদের পরিবারে সুখ-শান্তি ছিল। এখন এই অনলাইন জুয়া আমাদের পারিবারিক সুখ শেষ করে দিতাছে।’

জুয়ায আসক্ত ১৬ বছর বয়সী এক ছেলের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, আমার পরিবার আমাকে হাত খরচের জন্য টাকা দেয় আমি সে টাকা অল্প অল্প করে ঘুছিয়ে অনলাইন জুয়াতে প্রবেশ করায় টাকা বৃদ্ধির আশায়, কিন্তু টাকা ডাবল না হয়ে হেরে যায় তাঁদের কাছে, এই ভাবে আমি অনেক টাকা শেষ করেছি। এখন আমি আর জুয়ার মধ্যে নাই, চেষ্টা করছি এগুলো থেকে বের হয়ে আসার।

ঈশ্বরদী বাজারের এক দোকানের কর্মচারী বলেন, আমার বাসা নাটোর জেলায়,  আমি ঈশ্বরদীতে কাজ করি, আমি অনলাইনে টাকা লাগিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি, স্বল্প আয়ে কাজ করে আমি টাকা খরচ করি  

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন ক্যাসিনো, বেটিং ও গেমিং অ্যাপের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। প্রথমদিকে সামান্য কিছু টাকা জেতার সুযোগ পেলেও পরবর্তীতে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এই আসক্তি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি আসাদুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে অনলাইন জুয়া ব্যক্তিগত স্মার্টফোনের মাধ্যমে খেলা হওয়ায় সরাসরি অভিযান পরিচালনা করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ঈশ্বরদীর সামাজিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তারা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।