বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পুরোপুরি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ সরবরাহ করবে। ২০২৮ সালের মধ্যে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই প্রকল্পটি মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে যায়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান জানান, প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত হবে।

রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত এ প্রকল্পের মূল ব্যয় প্রায় ১ হাজার ২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় স্থানীয় মুদ্রায় প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ হলে অতিরিক্ত ব্যয় এবং জ্বালানি আমদানির খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে রূপপুর প্রকল্প দেশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে।

এদিকে সরকার ভবিষ্যতে ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এ ধরনের কেন্দ্র নির্মাণে বিভিন্ন দেশের নির্মাতাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। তবে আপাতত বড় আকারের নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর দেশে নতুন ভিত্তিভিত্তিক (বেসলোড) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিক করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকল্পটির সফল পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি, শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জনসচেতনতা এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে নির্মাণাধীন অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়া ও চীনের প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। একই সময়ে ভারত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং পাকিস্তানও চীনের সহায়তায় একাধিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।