জ্যৈষ্ঠ এলেই যেন বদলে যায় পাবনার ঈশ্বরদীর প্রতিটি গ্রামের চিত্র। চারদিকে পাকা রসালু লিচুর সমারোহে মুখর হয়ে ওঠে । লিচু মৌসুমে এখানকার বাড়িতে বাড়িতে উৎসবের আমেজ ও আত্মীয়স্বজনদের বেড়াতে আসা এক চিরায়ত ও আনন্দময় বাঙালি ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় এক মাস জুড়ে দেশী ও বোম্বাইসহ বিভিন্ন জাতের পাকা লিচু সংগ্রহ, বাছাই, গণনা,বাজারজাতকরণের কাজ চলে। যা পুরো পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তোলে। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার লিচুর ফলন দ্বিগুন হওয়ায় উৎসবে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।
বাগান মালিক ও লিচু চাষিরা জানান, লিচুর মৌসুম এলেই দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরা বাগান ঘুরে দেখতে এবং রসালু লিচু খাওয়ার জন্য বেড়াতে আসেন। পাকা টকটকে রসালু লিচুর সুবাস আর স্বাদে অতিথিদের আপ্যায়ন করা এখানকার মানুষের রীতিতে পরিণত হয়েছে। অতিথি বিদায়ের সময় উপহার হিসেবে লিচু দেওয়ার ঐতিহ্যও বেশ জনপ্রিয়।

লিচুর মৌসুমে পরিবারের সবাই মিলে গাছ থেকে লিচু পারা, বাছাই, গণনা , প্যাকেট করার পাশাপাশি একসাথে বসে লিচু খাওয়া এবং বাগানগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে এক দারুণ আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এসময় বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বাড়িতে বাড়িতে মৌসুমি পিঠা ও খাবারের আয়োজন করা হয়।
উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের লিচু চাষি আব্দুল হামিদ বলেন, আমাদের এলাকাতে লিচুই প্রধান ফসল। এখানকার শতকরা ৭০-৮০ ভাগ জমি জুড়ে শুধু লিচু বাগান। লিচু মৌসুম এলেই আমাদের বাড়িতে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। জামাই-মেয়ে, নাতি-নাতনি, বোন, ভগ্নিপতির পাশাপাশি অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা এসময় বাড়িতে বেড়াতে আসেন। দেশের অন্যান্য এলাকায় অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার পর যেমন নবান্ন উৎসব হয়। বাড়িতে বাড়িতে নতুন ধানের পিঠা-পায়েশ তৈরি হয়। খাওয়া-ধাওয়ার ধুম পড়ে যায়। ঠিক তেমনি আমাদের ঈশ্বরদীতে লিচু মৌসুম এলেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।

লিচুতে জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মন্ডল বলেন, ঈশ্বরদীতে এবার লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ায় সবাই আনন্দিত। এখন প্রতিটি পরিবারে-বসত বাড়িতে চলছে লিচুর উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ লিচু বাগান দেখতে আসছে। লিচুর ফলন, বিপপন, প্রক্রিয়াজাত অনেকেই স্বচক্ষে দেখে আনন্দিত হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিটি বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতে এসেছেন। তারাও নিজ হাতে গাছ থেকে লিচু ছিড়ে খাচ্ছেন। প্রতিটি পরিবারেই এখন উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে।
লিচু বাগান মালিক ও স্কুল শিক্ষক হুমায়ুন কবির তরুন বলেন, এখন লিচুময় ঈশ্বরদী। এবছর লিচুর ফলন ভালো হওয়ায় সবাই আনন্দিত। লিচুকে কেন্দ্র করে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাই একত্রিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এলাকার পথ-ঘাট, লিচু বাগান, প্রতিটি বাড়ি-ঘরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, এ উপজেলায় এবার ৩ হাজার ১শ’ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এবার লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এবার গতবারের চেয়ে তিনগুন ফলন হবে। কৃষকরা দামও ভালো পাবে। বাম্পার ফলনের ফলে কৃষকের আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে আশা করছি।